বিশেষ প্রতিনিধি:
সরকার সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করার পরে ফরিদপুর ৪ আসনের দুটি উপজেলায় চারটি খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলায় চারটি খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়। এই খাল খনন কর্মসূচির শেষে দুটি উপজেলার দুই নির্বাহী কর্মকর্তা সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন প্রায় এক কোটি টাকার উপরে।
সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে সততা ও স্বচ্ছতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুল হাসান ও সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ শাওন।
এই দুই উপজেলার অফিস সূত্রে জানাযায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুরে ইউনিয়নের ৪টি খাল পুনঃখনন প্রকল্প শেষে সব খরচ মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ১ কোটি ৮০ হাজার ০৫ শত ৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
এরমধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৫ টাকা। সেখান থেকে ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার ০৯ শত ১৬ টাকা ফেরত দেয়া হয়।
অপরদিকে সদরপুর উপজেলায় বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ১৮ লক্ষ ৩ হাজার ৮০৪ টাকা বরাদ্দ ছিল। সেখান থেকে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ০৬ শত ২০টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়।
এর মধ্যে ভাঙ্গা উপজেলার ঘারুয়া ইউনিয়নের শরিফাবাদ হ্যালন ফকির এর বাড়ী সংলগ্ন খারদিয়া হইয়া শাহজাহান শেখের বাড়ী হয়ে কুমার নদী পর্যন্ত খাল পূণঃ খনন ৬ কিলোমিটার ও মানিকদাহ ইউনিয়নের বলেরবাগ হইতে সোনাখোলা পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার মিলিয়ে মোট ১৪ কিলোমিটার খাল খনন হয় এই উপজেলায়।
এছাড়া সদরপুর উপজেলার লোহারটেক ব্রীজ হতে শ্রীরামদি বাজার পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার ও দড়িকৃষ্ণপুর কাটাখাল ব্রিজ হতে ভুবনেশ্বর নদী অভিমুখী খাল সাড়ে ৪ কিলোমিটার মিলিয়ে মোট সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল খনন হয় এই উপজেলায়।
দুই উপজেলা মিলে সাড়ে ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খনন কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ২৬৯ টাকা। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই উন্নয়ন কাজ শেষে শ্রমিকসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ মিটিয়ে বিপুল পরিমাণের এই অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিলে ফেরত পাঠানো হয়।
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি ইশতিহার ‘খাল খনন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা অনিয়ম ও অসন্তোষের চিত্র দেখা গেলেও ফরিদপুরের এই দুটি উপজেলার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি টাকাও অপব্যয় না করে পুরো কাজটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় এখন রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবার প্রশংসায় ভাসছেন এই দুই সরকারি কর্মকর্তা।
দুই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল এই খাল খনন কর্মসূচি সকল সময় খোঁজখবর রাখছিলেন। কাজের গুণগত মান যাচাই করতে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এসেছিলেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম। খালগুলো পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসক উভয়েই কাজের চমৎকার ফিনিশিং ও অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় গত ১৬ মার্চ দেশব্যাপী নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথম খাল খনন কাজের উদ্বোধন করা হয়। সেদিন এর উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদা ইউনিয়নের খাল খনন কর্মসূচির সদস্য জুয়েল বললেন, আমাদের ইউএনও স্যার অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। খাল খনন চলাকালীন তিনি নিয়মিত সাইটে এসে কাজ তদারকি করতেন এবং আমাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন।
ঘারুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ মনসুর জানালেন, এই এলাকার খাল খনন কর্মসূচিতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সবকিছু করা হয়েছে বলে আমরা দেখেছি। শ্রমিকদের মজুরিসহ সব ধরনের বিল যথানিয়মে ও স্বচ্ছতার সাথে পরিশোধ করেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার খাল খনন প্রকল্পের সদস্য জহুরুল মুন্সি বললেন, অন্যান্য উপজেলার চেয়ে আমাদের এখানে অনেক ভালো কাজ হয়েছে। বর্তমানে যিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রয়েছেন তিনি অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ। তার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
চর বিষ্ণুপুর এলাকার খাল খনন কর্মসূচির সদস্য বাচ্চু কাজী জানালেন, আমাদের ইউএনও স্যারের জন্য কাজের মান যেমন ভালো হয়েছে খালের। তেমনি কোনরকম নয় ছয় করেননি এই কাজে। যে কারণে প্রকল্প থেকে উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত গেল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুল হাসান বলেছেন, আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল উন্নয়ন কাজের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততা নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পে আমাদের পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিল, আমরা সরকারি টাকার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। কাজ শেষে উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উঠানো হয়। এক্ষেত্রে আমার কঠোর নজরদারি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিসি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক স্যার এসেছিলেন আমাদের এই কাজ দেখতে। তিনিও কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন এ বিষয়ে।
এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ শাওন জানালেন, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প এই খাল খনন কর্মসূচি। সেই কর্মসূচি প্রথম যে ১৮টি খাল প্রধানমন্ত্রী একযোগে সারাদেশে উদ্বোধন করেন তার ভিতরে আমার উপজেলার দুটি খাল ছিল। এই খাল খনন কর্মসূচিতে কোনরকম নয়-ছয়ের এর সুযোগ দেয়া হয়নি। অনেকে অনেক কথা বললেও আমরা কাজটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করেছি। আমরা বিশ্বাস করি- স্বচ্ছ প্রশাসন ও টেকসই উন্নয়নই একটি অঞ্চলের অগ্রগতির চাবিকাঠি। এই প্রকল্পে আমাদের পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিল, আমরা সরকারি টাকার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। কাজ শেষে উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে, কারণ সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারই সুশাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।